আবাদ ও ফলনে ছাড়িয়েছে লক্ষমাত্র, বাজার মুল্যও গত বছরের তুলনায় মনে হাজার টাকার বেশি
সোনালী আঁশে স্বপ্ন বুনছেন যশোরের চাষিরা
- আপডেট সময় : ১২:২৭:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৫ ১৪৪ বার পড়া হয়েছে
বর্ষার স্নিগ্ধতায় ভিজে উঠা যশোরের বিস্তীর্ণ মাঠে সবুজ পাটগাছের দুলুনিতে ভেসে আসছে সোনালী আঁশের ইঙ্গিত। আগাম বৃষ্টির কারনে যেমন হয়েছে ভালো ফলন তেমনি বেগ পেতে হচ্ছে না পাট জাগেও। চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। একই সাথে উৎপাদনেও লক্ষমাত্র ছাড়িয়েছে পাট চাষীরা। কৃষকের চোখে এখন শুধু স্বপ্ন, ভালো ফলন আর ন্যায্যমূল্যে বিক্রির আশ্বাস। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পাটের চাহিদা বেড়েছে। এই সুযোগে যশোরের অনেক চাষি এবার জমি বাড়িয়ে পাট চাষ করেছেন। বীজ ও সার সহায়তা, সময়মতো বর্ষার পানি, আর সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা থাকলে তারা আশা করছেন রেকর্ড লাভবান হবে।
সোনালি আঁশ খ্যাত পাট চাষে একসময় ভাটা পড়েছিল যশোর অঞ্চলে। দাম কমে যাওয়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন অনেক কৃষক। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভালো দাম পাওয়ায় আবারও আগ্রহ তৈরি হয়েছে কৃষকদের মধ্যে। চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। একই সাথে উৎপাদনেও লক্ষমাত্র ছাড়িয়েছে পাট চাষীরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। ফলে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন কৃষকরা।
এইবছর যশোর জেলার আট উপজেলায় পাটের আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি অফিস। তাদের দেয়া তথ্যমতে, যশোর জেলায় চলতি বছরে ২৪ হাজার ৩২৪ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। যা লক্ষমাত্রার চেয়ে বেশি ৭৬৪ হেক্টর জমিতে। এইবছর পাটের উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছিলো হেক্টর প্রতি ২৫ মন। যদিও ফলন হয়েছে ৩০ মনের বেশি। গত বছরের তুলনায় পাটের আবাদ এবং উৎপাদন দুটোই বেশি। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় সেচ খরচও বাড়েনি এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে রোগ-পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম হয়েছে। কৃষি বিভাগ মনে করছে, বাজারে ভালো দাম পেলে লাভবান হবেন কৃষকেরা, যা ভবিষ্যতে পাটের চাষ আরও বাড়াতে সহায়ক হবে।
বর্তমান বাজার অনুযায়ী প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা মণ। যা গত বছর ছিল আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা মণ। এইবছর বাড়তি দাম পেয়ে খুশি সাধারণ চাষি ও ব্যবসায়ীরা। সরেজমিনে জেলার কয়েকটি উপজেলায় ঘুরে দেখা যায়, জমি থেকে পাট কর্তন করে পানিতে জাগ দেয়া এবং কিছু জায়গায় পাট ছাড়িয়ে নেয়ার কাজ করছেন চাষিরা। কৃষ্ িবিভাগ বলছে প্রায় ৬০ শতাংশ পাট কাটা হয়ে গেছে।
সাত মাইল বাজারের পাট ব্যবসায়ী আইতাল হোসেন বলেন, আমরা পাটের মান অনুযায়ী ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা মণ দরে পাট কিনছি। তিনি বলেন, দাম আরো বাড়তে পারে।
জেলার সদর উপজেলার সাত মাইল একালার পাট চাষী নান্নু আবির বলেন, ‘গত বছর পাঁচ বিঘা জমিতে পাটের চাষ করেছিলাম। যে ছিলো তাতে লোকসান হয়নি। এবার ৮ বিঘা জমিতে আবাদ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে যে দাম তাতে বেশ লাভবান হব।
চাষি তোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘পাট চাষে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় জাগ দেওয়ার জায়গা পাওয়া। অনেক সময় দূরে জাগ দিতে গিয়ে খরচ বেড়ে যায়। তবে এবার বর্ষা আগেই শুরু হওয়ায় সেই সমস্যাও হয়নি। আশা করছি এবার দাম ভালো পাব। আমরা স্বপ্ন দেখছি, পাট চাষে আমাদের মতো কৃষকদের সুদিন ফিরবে।’
স্থানীয় কৃষক আজিজুল হক বলেন, পাট আমাদের শুধু টাকা দেয় না, এটা আমাদের গর্ব। পাটের সাথে আমাদের বাপ-দাদার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তবে কৃষকদের দাবি, বাজারে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি ক্রয়ব্যবস্থা চালু হলে সোনালী আঁশের এই স্বপ্ন সত্যি হতে বেশি সময় লাগবে না।
কৃষি কর্মকর্তা মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘পাট চাষে কৃষকদের মধ্যে সুদিন ফিরেছে। সরকার প্রণোদনা দেওয়ায় কৃষকেরা উপকৃত হয়েছেন। পাটজাত পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত হওয়ায় এর কদরও বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বাজারমূল্যও। তবে কৃষক যাতে কাঙ্খিত দাম পায়, সে জন্য বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় পাটের আবাদ এবং উৎপাদন দুইটাই বেশি হয়েছে। সার্বিক ভাবে এই বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাট পঁচাতে কোন সমস্য হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত জেলায় জমি থেকে ৬০ শতাংশ পাট কর্তন হয়েছে। দাম ভালো থাকায় আশা করছি কৃষক এইবার লাভবান হবেন।








