স্মার্টফোনে বন্দী যশোরের নতুন প্রজন্ম, ভুলে যাচ্ছে নাটক, সংগীত ও আবৃত্তির মঞ্চ
- আপডেট সময় : ১২:৩৮:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৫ ১৪১ বার পড়া হয়েছে
এক সময় যশোর শহর ছিল নাট্যচর্চা, সঙ্গীত এবং আবৃত্তিতে মুখর। , শিল্প সাংস্কৃতির তির্থভ’মি, সর্বপরি সাংস্কৃতির রাজধানী ক্ষ্যাত যশোরের শিল্পকলা একাডেমি, নাট্যকলার বকুলতলা মঞ্চ, বিবর্তন, নন্দন, চাদের হাট প্রাঙ্গন কিংবা টাউন হল ছিল তরুণদের প্রাণ। এখন সেই চেনা দৃশ্য যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। নাট্যদলগুলোতে সদস্য সংকট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দর্শকের অনাগ্র সব মিলিয়ে যশোরের সংস্কৃতিচর্চা আজ সংকটের মুখে।
আগে প্রতি শুক্রবার আমাদের নাটকের মহড়া হতো। এখন মাসে একবারও মঞ্চে উঠা হয় না, কারণ নতুন সদস্য নেই, বললেন স্থানীয় নাট্যকর্মী রিপন হোসেন। তিনি বলেন, শিল্প সাংস্কৃতির তীর্থভুমি, সর্বপরি সাংস্কৃতির রাজধানী বলা হয় যশোরকে। তিনি বলেন আজ এটা গল্পে পরিনত হয়েছে, কারন হিসেবে তিনি বলেন, আমরা সংগঠকরা পাচ্ছিনা আমাদের বেস্টটা দিতে অন্যদিকে নতুন প্রজন্মও স্যোসাল মিডিয়া থেকে বের করে আনার জন্য যেটা দরকার সেটাও করতে পারছি না। তিনি বলেন শিল্পকলা একাডেমিসহ লিডিং সংগঠন গুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে।
নাট্যভিনেতা মনিরুল ইসলাম মনে করেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন সদস্য যুক্ত না হওয়ার পিছনে একটি বড় কারণ হলো দর্শকেরা বিকল্প বিনোদন খুঁজে নিয়েছে। এটা ঠিক ২ দশক আগেও মঞ্চই ছিল মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে নানারকম বিনোদন। দর্শকদের মঞ্চে ফেরাতে হলে ভালো মানের গল্পের মাধ্যমে নাটক সৃষ্টি করতে হবে। একই সাথে আবৃত্তি, গান, নৃত্য – সব শিল্প মাধ্যমে প্রযুক্তির মেলবন্ধন করাতে হবে। কারণ এখনকার শিল্পীরা ফেসবুক ইউটিউবে সেলিব্রেটি হতে চায়। সেখানে খ্যাতি আছে টাকাও আছে। ডিজিটাল প্লাটফর্মের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মঞ্চের কাজ এগিয়ে নিতে পারলে দর্শক এবং শিল্পী-উভয় শ্রেণীকে সাংস্কৃতিক মঞ্চে ফেরানো সম্ভব হবে।
বিবর্তন যশোরের সাবেক সাধারন সম্পাদক নাট্যভিনেতা এইচ আর তুহিন বলেন, আমাদের অবিভাবকরা এখন সন্তানদের কাছে এ প্লাস চাই, তারা সন্তানের মানসিক বিকাশ চাই না। তাছাড়া বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাব আর ধর্মীয় গোড়ামীর কারনেও অবিভাকরা সন্তানদের সাংস্কৃতি চর্চা থেকে দুরে রাখতে চাইছে। যার ফলে তরুণদের বড় অংশ সময় কাটাচ্ছে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকে। মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তির কারনে সৃজনশীলতা বিকাশে উৎসাহের অভাব, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব কমে গেছে। তাছাড়া নাটক বা গানের সঙ্গে পেশাগত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয় বলে অনেকেই উৎসাহ হারায়।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব চাদের হাট যশোরের প্রাণ পুরুষ ফরাজী আহমেদ সাইদ বুলবুল বলেন
“যশোরে আমাদের নাট্যধারা গড়ে উঠেছিল আন্দোলনের অংশ হিসেবে। আজ সেটা শুধুই স্মৃতি। নতুন প্রজন্মকে টানার জন্য যৌথ উদ্যোগ দরকার।” তিনি বলেন স্কুল ও কলেজে নিয়মিত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। যশোর শিল্পকলা একাডেমিকে আরও কার্যকরভাবে সংস্কৃতি-চর্চায় সম্পৃক্ত করতে হবে। ফান্ডিং বা স্টাইপেন্ড চালু করে তরুণদের নাটক, সংগীত বা আবৃত্তিতে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। একই সাথে ডিজিটাল মাধ্যমে নাটক বা সংগীত প্রচার করে তরুণদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারলে আবার কিছু নতুন মুখ সৃষ্টি হতে পারে।
নন্দন যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন বলেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে নাটক, সংগীত ও আবৃত্তির মঞ্চের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার কয়েকটি কারণ হল: ডিজিটাল মাধ্যমের প্রতি আকর্ষণ, মঞ্চ পরিবেশনার অভাব, এবং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রতি অনীহা।
আসলে, নতুন প্রজন্ম এখনকার ডিজিটাল মাধ্যমে বেশি আকৃষ্ট। তাদের কাছে নাটক, সংগীত, এবং আবৃত্তির মতো ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমগুলো হয়তো ততটা আকর্ষণীয় মনে হয় না, কারণ তারা অনলাইন গেমস, সামাজিক মাধ্যম, এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় কাটায়। এছাড়াও, মঞ্চ পরিবেশনার অভাবও একটি বড় কারণ। অনেক ক্ষেত্রে, ভালো মানের নাটক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য প্রয়োজনিয় সুযোগ-সুবিধা এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাব দেখা যায়, যা নতুন প্রজন্মের আগ্রহকে কমিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রতি অনীহা বা এর গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণেও অনেকে এসব মাধ্যম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে হলে, নতুন প্রজন্মকে এর গুরুত্ব এবং তাৎপর্য বোঝানো প্রয়োজন। তাদের জন্য আরও বেশি করে এই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা উচিত, যা তাদের আকৃষ্ট করবে এবং এই মাধ্যমগুলোর প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। সাংস্কৃতিক চর্চা শুধু বিনোদনের জন্য নয়, এটি সমাজকে সুন্দর, মানবিক ও চিন্তাশীল করে তোলে। যশোরের মঞ্চের আলো যেন নিভে না যায়, সে জন্য সময়মতো উদ্যোগ নেয়া দরকার। না হলে একটি ঐতিহ্য একদিন ইতিহাস হয়ে থাকবে।








